রক্তস্নাত জুলাই গণঅভ্যুত্থানের দুই বছর: বিচার প্রক্রিয়ায় শ্লথ গতি, রাজপথের উত্তাপ ও সংস্কারের চ্যালেঞ্জ

আজ ২ আগস্ট, চব্বিশের ঐতিহাসিক ‘দ্রোহযাত্রা’ ও ছাত্র-জনতার রক্তস্নাত গণঅভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বার্ষিকী। আবু সাঈদসহ শত শত শহীদের আত্মত্যাগের মধ্য দিয়ে যে গণবিস্ফোরণ ঘটেছিল, তার দুই বছর পূর্তিতে দাঁড়িয়ে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গন এক জটিল সন্ধিক্ষণ পার করছে। একদিকে শহীদ পরিবারগুলোর দীর্ঘ প্রতীক্ষিত ন্যায়বিচার পাওয়ার আকুতি, অন্যদিকে রাজপথে ক্রমবর্ধমান রাজনৈতিক অসহিষ্ণুতা এবং সংস্কার বাস্তবায়নে ধীরগতি—সব মিলিয়ে আজকের দিনটি এক গভীর আত্মসমালোচনার বার্তা নিয়ে এসেছে।
বিচার প্রক্রিয়ায় দীর্ঘসূত্রিতা ও হতাশা
ফ্যাসিস্ট শাসক শেখ হাসিনার পতনের দুই বছর অতিক্রান্ত হলেও গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার বিচারিক কার্যক্রমে দৃশ্যমান শ্লথগতি সাধারণ মানুষের মনে ক্ষোভের সৃষ্টি করেছে।
মামলা ও আসামির পরিসংখ্যান: জুলাই আন্দোলন-সংশ্লিষ্ট সারা দেশে মোট ১ হাজার ৮৬৫টি মামলার মধ্যে হত্যা মামলা রয়েছে ৮০ গত১টি এবং হত্যাচেষ্টাসহ অন্যান্য অভিযোগে মামলা ১ হাজার ৬৪টি। এসব মামলায় মোট এজাহারনামীয় আসামি ১ লাখ ৫৪ হাজার ৩৩১ জন।
তদন্তের ধীরগতি: গত ১৩ জুলাই পর্যন্ত প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, মাত্র ১০১টি হত্যা মামলার তদন্ত শেষ করে আদালতে প্রতিবেদন দাখিল করা হয়েছে, যা মোট মামলার মাত্র ১৪ শতাংশ। এর মধ্যে অভিযোগপত্র (চার্জশিট) দেওয়া হয়েছে ৬৩টিতে এবং চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেওয়া হয়েছে ৩৮টিতে।
ঢাকা মহানগরীর চিত্র: ডিএমপির ৫০ থানায় দায়েরকৃত ৭৮৯টি মামলার মধ্যে বিগত ২১ জুলাই পর্যন্ত মাত্র ৩৭টির তদন্ত শেষ হয়েছে। সাবেক আইজিপি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল মামুন, এ কে এম শহীদুল হক এবং সাবেক ডিএমপি কমিশনার আছাদুজ্জামান মিয়াসহ কিছু পুলিশ সদস্য ও দুই হাজারেরও বেশি অন্যান্য আসামি গ্রেপ্তার হলেও সামগ্রিক তদন্ত প্রক্রিয়া অত্যন্ত মন্থর।
রাজনৈতিক অসহিষ্ণুতা ও রাজপথের উত্তাপ
অভ্যুত্থান-পরবর্তী বাংলাদেশে ডিজিটাল ও বাস্তব পরিসরে মতপ্রকাশের সুযোগ বাড়লেও মাঠপর্যায়ের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে এখনো ফ্যাসিবাদী প্রবণতার রেশ রয়ে গেছে।
সহিংসতা ও অসহিষ্ণুতা: সাম্প্রতিক সময়ে হবিগঞ্জ, সিলেট, কুড়িগ্রাম ও বগুড়ায় এনসিপি নেতা নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর বক্তব্যকে কেন্দ্র করে সরকারি দলের মাঠপর্যায়ের নেতাকর্মীদের অসহিষ্ণু আচরণ ও হামলার ঘটনা জুলাইয়ের মূল চেতনার পরিপন্থী।
পেশিশক্তির রাজনীতি: রাজনৈতিক মতপার্থক্যের জবাব মাইরের ভাষা বা পেশিশক্তির প্রদর্শনের মাধ্যমে দেওয়ার প্রবণতা পুরোনো স্বৈরতান্ত্রিক চরিত্রের বহিঃপ্রকাশ। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ভিন্নমত ও সমালোচনা সহ্য করার মানসিকতার কথা বললেও মাঠপর্যায়ে তার প্রতিফলন ঘটেনি।
পতিত শক্তির অপচেষ্টা: বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, এনসিপির কর্মসূচিতে হামলা ও সংঘাতের সুযোগ নিয়ে পতিত আওয়ামী শক্তি বিএনপির ঘাড়ে বন্দুক রেখে ফায়দা তোলার চেষ্টা করছে। সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা নিয়ে আওয়ামী লীগের অচেনা মুখগুলো এসব হামলায় সম্পৃক্ত হচ্ছে, যা দেশের সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির জন্য মারাত্মক হুমকিস্বরূপ।
সংস্কার ও স্থিতিশীলতার চ্যালেঞ্জ
চব্বিশের অভ্যুত্থানের অন্যতম প্রধান আকাঙ্ক্ষা ছিল রাষ্ট্র, সরকার ও শাসনকাঠামোয় আমূল সংস্কার আনা। নির্বাচিত সরকারের প্রায় ছয় মাস পেরিয়ে গেলেও ঐকমত্য হওয়া সংস্কারগুলোর বাস্তবায়ন ও গতিপ্রকৃতি নিয়ে জনমনে মিশ্র প্রতিক্রিয়া রয়েছে।
সংসদের ভেতর কিছুটা বোঝাপড়া দেখা গেলেও রাজপথে পারস্পরিক বিরোধ ও উত্তাপ দিন দিন বাড়ছে।
রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ব্যাহত হলে এবং সহনশীলতার অভাব দেখা দিলে তা ফ্যাসিবাদকে পুনরায় মাথাচাড়া দিয়ে ওঠার সুযোগ করে দিতে পারে।
জুলাই অভ্যুত্থানের সুফল রক্ষার্থে এবং শহীদদের রক্তের সাথে বেঈমানি এড়াতে দ্রুততম সময়ে অপরাধীদের বিচার নিশ্চিত করা এবং রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে গণতান্ত্রিক সহনশীলতা ফিরিয়ে আনা এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।












