আলোচনার দাবি ও সামরিক পদক্ষেপের হুমকি
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের সাথে ‘ভালো’ এবং ‘গভীর’ আলোচনা চলছে এমন দাবি করেছেন। তবে একই সময়ে তিনি স্পষ্ট করেছেন, এই বার্তা বিনিময় ব্যর্থ হলে যুক্তরাষ্ট্র আবারও ‘খুব কঠোর সামরিক পদক্ষেপ’ নিতে বাধ্য হবেন। মিশিগন州 গমনকল্পিত অবস্থায় এয়ার ফোর্স ওয়ানে উড়েগামীর সময় ট্রাম্প সাংবাদিকদের জানান, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইরানের ভালো আলোচনা চলছে এবং ভালো কিছু ঘটার সম্ভাবনা আছে। তিনি ইরানকে স্যাটেলাইট ছবি পাঠিয়ে সহায়তা করার বিষয়ে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে কথা বলার কথাও জানিয়েছেন। অ্যাক্সিওসের সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেন, ‘ইরানের সঙ্গে খুব গভীর আলোচনা চলছে। তবে তা ব্যর্থ হলে আমাদের আবারও খুব কঠোর সামরিক পদক্ষেপে ফিরতে হবে।’ ইরানকে কতদিনের জন্য সময় দেওয়া হবে এই প্রশ্নে তাঁর উত্তর ছিল, ‘সবসময় নয়, বেশি সময় নয়। হয় দ্রুত অগ্রগতি হবে, না হলে হবে না।’
কেন থামছে মার্কিন হামলা
যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে জানা যায়, ট্রাম্প পরিচালিত অভিযান গত কাল থেকে প্রায় চার দিন ধরে স্থগিত রয়েছে। মার্কিন সামরিক কর্মকর্তারা এই সিদ্ধান্তের পেছনে অস্ত্র ও সামরিক সরঞ্জামের ঘাটতিকে কারণ হিসেবে মনোনীত করেছেন। তবে ট্রাম্প এই ধারণাকে নাকচ করে দিয়ে বলেছেন, তিনি মধ্যস্থতাকারী দেশগুলোর অনুরোধেই হামলা বন্ধ করেছেন। সিএনএনের খবরে জানা গেছে, গত শুক্রবার হোয়াইট হাউসে আয়োজিত একটি বৈঠকে মার্কিন জয়েন্ট চিফস অব স্টাফের চেয়ারম্যান জেনারেল ড্যান কেইন সামরিক গোলাবারুদের মজুত নিয়ে তাঁর গভীর উদ্বেগ তুলে ধরেছেন। আরও বলা হয়েছে, ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সও এই বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন। ওয়াল স্ট্রিট জার্নালে ট্রাম্প বলেছেন, বিশ্বের যেকোনো দেশের তুলনায় যুক্তরাষ্ট্রের কাছে অনেক বেশি গোলাবারুদ আছে, এমনকি দরকারের চেয়েও বেশি। গোলাবারুদের সংকটের প্রসঙ্গকে তিনি সম্পূর্ণরূপে অস্বীকার করেছেন।
ইরানের পাল্টা দাবি ও হরমুজ প্রণালির অবস্থা
ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই গতকাল সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে নতুন করে আলোচনার জন্য ইরান কোনো অনুমতি বা অনুরোধ জানায়নি। তিনি ওয়াশিংটনের এমন দাবিকে ‘মনগড়া’ বলে চিহ্নিত করেছেন। বাঘাই বলেন, হরমুজ প্রণালি নিয়ে ওমানের সঙ্গে আলোচনা সম্পূর্ণদূর্বৃত্তভাবে দ্বিপক্ষীয়ভাবে চলছে। গত শুক্রবার ও শনিবার দুই দেশের কর্মকর্তারা নিরাপদ নৌ চলাচল নিশ্চিত করার নীতিগত ও কারিগর বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা করেছেন। ইরান দাবি করছে, প্রণালির ব্যবস্থাপনা, নৌযান চলাচলের তদারকি ও সেবা ফি আদায়ের অধিকার তারা কখনোই প্রকাশ্যে রাখবে না। দেশটির রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, গতকাল প্রণালিতে অনুমতি ছাড়া নির্ধারিত পথের বাইরে দিয়ে চলার চেষ্টা করা হয়েছিল, এবং এই ঘটনায় ছয়টি জাহাজকে ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছে। তেহরান দাবি করেছে, হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ এখনো তাদের হাতে রয়েছে। হামলা বন্ধ থাকার কারণে ইরানও পাল্টা হামলা স্থগিত রেখেছে। ওমানের সঙ্গে মিলে নৌযান চলাচলের নতুন ব্যবস্থা তৈরির কাজ চলছে, যার সঙ্গে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কোনো সরাসরি সম্পর্ক নেই।

যুদ্ধ থামলেও উত্তেজনা বাড়ছে
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে পাল্টাপাল্টি হামলা বন্ধ থাকলেও মধ্যপ্রাচ্যের উপসাগরীয় অঞ্চলে উত্তেজনা কমেনি ঠিকই। গতকাল সৌদি আরব প্রকাশ করেছে, তারা ইরাক থেকে ছোড়া কয়েকটি ড্রোনকে ভূপাতিত করেছে। সৌদিদের দাবি, ইরান-সমর্থিত গোষ্ঠীগুলো তেল স্থাপনাসমূহকে লক্ষ্য করে এসব হামলার চেষ্টা চালিয়েছে। একই সময়ে ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীরা সৌদি তেল পরিবহন-সম্পর্কিত স্থাপনায় ড্রোন হামলার দাবি করেছেন। জর্ডান ও ইরাকের কুর্দিস্তানেও ড্রোন হামলার ঘটনা ঘটেছে। এ সব ঘটনায় তাৎক্ষণিকভাবে কেউ হতাহত হয়েছে কিনা সেই বিষয়ে কোনো নিশ্চিত তথ্য জানা যায়নি। রায়টার্সের প্রতিবেদনে জানা গেছে, টানা ১৩ দিন বোমা হামলার পর মার্কিন সামরিক কর্মকর্তারা ট্রাম্পকে জানান, এই অভিযানের কার্যকারিতা প্রায় শেষ পর্যায়ে পৌঁছে গেছে। হামলার নিশানাও দ্রুত কমে আসছে। তবে সিআরএন-এর সঙ্গে সম্পর্কিত কোনো তথ্যে এসব অভিযোগের প্রমাণ স্পষ্টভাবে তুলে ধরা হয়নি।
আলোচনার পথ অনিশ্চিত, আহত সেনার সংখ্যা বেড়েছে
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে গত ১৭ জুন একটি প্রাথমিক সমঝোতা স্মারক সই হয়েছিল। চুক্তি অনুযায়ী ৬০ দিনের মধ্যে বিস্তারিত বাঁধামালা আলোচনা এবং সংলাপের মধ্য দিয়ে একটি স্থায়ী যুদ্ধবিরতি চুক্তি তৈরি হওয়ার পরিকল্পনা ছিল, যার আওতায় ছিল ইরানের পরমাণু কর্মসূচিসহ বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কিন্তু হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে নতুন বিরোধ দেখা দেওয়ায় পুনরায় পাল্টাপাল্টি হামলা শুরু হয়ে যায়। প্রচলিত চুক্তির শর্ত অনুযায়ী প্রণালিতে অবাধ নৌ চলাচল নিশ্চিত করা আবশ্যক। অন্যদিকে ইরানের অবস্থান, স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারকই তাদের প্রণালি পরিচালনা ও নৌ চলাচল তদারকির অধিকার প্রদান করেছে। বার্তা সংস্থা রয়টার্সের হিসাব অনুযায়ী, আজ ২৮ জুলাই এই সংঘাতের পাঁচ মাস পূর্ণ হলেও সংকটপূর্ণ পরিস্থিতি পুরোপুরি সমাধানের কোনো স্পষ্ট লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। যুদ্ধ শুরুর পর থেকে যুক্তরাষ্ট্রের ১৮ জন সেনা নিহত এবং ৬২৪ জন আহত হয়েছেন, এমনটি সিএনএনের খবরে জানা গেছে। সিবিএস নিউজ ও ইউগভের এক জরিপে দেখা গেছে, ৭৬ শতাংশ মার্কিন নাগরিকের মতে ইরান যুদ্ধ ট্রাম্প প্রশাসনের আগের প্রত্যাশার তুলনায় অনেক বেশি কঠিন হয়ে উঠেছে। তেহরান অভিযোগ করেছে, যুক্তরাষ্ট্রের পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি দেশও আমেরিকার বিরুদ্ধে সামরিক অভিযানে অংশ নিয়েছে। আলোচনার ফলাফল এখনো সম্পূর্ণ অনিশ্চিত, এবং শরণার্থী সংকট কেবল মার্কিন ও ইরানি জনগোষ্ঠীরাই নয়, অঞ্চলব্যাপী স্থিতিশীলতাকেও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে।






